দুর্নীতি ও পরিণতি: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন কাহিনীর বিশ্লেষণ
দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাহিনী চিত্রায়িত করা হয়েছে মূলত বৃদ্ধির হার, রপ্তানি আয়, এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মেগা প্রকল্পগুলো “উন্নয়নের” দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে ধরা হতো, যা প্রায়শই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দর্শকের কাছে অগ্রগতির সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এই বাহ্যিক সূচকের আড়ালে রয়েছে একটি আরও জটিল ও চিন্তার বিষয়: শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা এবং নিয়মভিত্তিক শাসনবিহীন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপগুলো—মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান হ্রাস, ঋণের চাপ, মূলধনপলায়ন, এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ক্ষয়—একটি মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করেছে যা বহুদিন ধরে উপেক্ষিত ছিল। গণতান্ত্রিক শাসনবিহীন বৃদ্ধি সহজেই ভঙ্গুর, বিপরীতযোগ্য, এবং গভীরভাবে অসাম্যপূর্ণ।
অর্থনীতির প্রতিষ্ঠানগত ভিত্তি
মূলত, একটি অর্থনীতি কেবল বাজার এবং সংখ্যার সমষ্টি নয়; এটি একটি নিয়ম, বিশ্বাস এবং প্রতিষ্ঠান দ্বারা শাসিত ব্যবস্থা। স্বাধীন আদালত, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পেশাদার সরকারি সেবা, এবং জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্বাভাস, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বনির্ধারিত কাঠামো তৈরি করে।
বাংলাদেশে, গত দশকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্রমশ দুর্বল হওয়া সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে আসে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রমাণভিত্তিক নীতি থেকে আনুগত্যভিত্তিক শাসনে রূপান্তরিত হয়। এটি দক্ষতা হ্রাস করে, দুর্নীতি বৃদ্ধি করে এবং সম্পদ বণ্টনকে বিকৃত করে—যা চুপচাপ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
জবাবদিহিতা হারালে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়
দুর্বল গণতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষতিকারক ফলাফলগুলোর মধ্যে একটি হলো জবাবদিহিতার অভাব। কার্যকর সংসদীয় পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন মিডিয়া, বা নিরপেক্ষ তদারকি সংস্থা ছাড়া, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি নিরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।
ফলস্বরূপ, বাংলাদেশে দেখা গেছে:
-
প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি
-
সীমিত উৎপাদনমূলক ফলাফলের সাথে সরকারি ঋণের বৃদ্ধি
-
রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ
-
অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থার হ্রাস
এগুলো বিচ্ছিন্ন শাসনব্যর্থতা নয়; বরং সরাসরি রাজস্ব চাপ, মূল্যস্ফীতি, এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার উপর সরকারি ব্যয়ের হ্রাসে রূপান্তরিত হয়।
রাজনৈতিক স্বার্থের অর্থনীতি ও বাজারের বিকৃতি
রাজনৈতিক প্রাধান্য দ্বারা চালিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের উদাহরণ সৃষ্টি করে। এই ধরনের ব্যবস্থায় সাফল্য নির্ধারিত হয় না উৎপাদনশীলতা বা উদ্ভাবনের মাধ্যমে, বরং ক্ষমতার নিকটতার মাধ্যমে। এটি প্রতিযোগিতা হ্রাস করে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে চাপে ফেলে এবং সম্পদ কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
বাংলাদেশে বারবার ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ defaults, এবং রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যবসায়ীর প্রতি নিয়ন্ত্রক নরম মনোভাব অর্থনৈতিক খাতকে দুর্বল করেছে। ব্যাংক যদি ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ বহন করতে বাধ্য হয়, তবে এর বোঝা শেষমেশ সাধারণ নাগরিকের উপর পড়ে—মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, এবং ঋণপ্রাপ্তির সীমিত প্রবেশাধিকার হিসেবে।
গণতন্ত্র ও বিনিয়োগকারীর আস্থা
স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় বিনিয়োগকারীর কাছে স্থিতিশীলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং আইন শাসন গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাসযোগ্যতা বিহীন নির্বাচন, পরামর্শবিহীন নীতি সিদ্ধান্ত, এবং রাজনৈতিক কারণে হঠাৎ নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি করে।
সময়ক্রমে, এই অনিশ্চয়তা প্রকাশ পায়:
-
মূলধনপলায়ন
-
বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগের হ্রাস
-
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
-
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি
যখন বিনিয়োগকারীরা আইন বা নীতি নিয়ে রাজনৈতিকভাবে স্বার্থান্বেষী হঠাৎ পরিবর্তনের আশঙ্কায় থাকে, তখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই রাখা সম্ভব নয়।